Daffodil Computers Ltd.
E-Health / Protect Your Health => For All / Others => Topic started by: bbasujon on January 13, 2012, 06:10:13 PM
-
চলছে গ্রীষ্মকাল। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড গরমে চারদিক অস্থির। সেই সঙ্গে রয়েছে আর্দ্রতা। এ কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। গরমে বাড়ছে স্বাস্থ্যসমস্যা, রোগ, জ্বরা। ঘামাচি কিংবা পানিস্বল্পতার মতো সমস্যা প্রায় প্রত্যেকেরই হচ্ছে। আবার কেউ কেউ হিটস্ট্রোকের মতো গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এর সঙ্গেও হতে পারে অবসাদ, অ্যালার্জি, সূর্যরশ্মিতে চর্ম পুড়ে যাওয়া, হজমের অভাবে বমি বা ডায়রিয়াজনিত রোগ ইত্যাদি।
গরমের কারণে সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় পানিস্বল্পতা। প্রচুর ঘামের কারণে পানির সঙ্গে সঙ্গে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় লবণও বেরিয়ে যায়। সাধারণত এর ফলে শরীরের রক্তচাপ কমে যায়, দুর্বল লাগে, মাথা ঝিমঝিম করে। পানিস্বল্পতা গরমের খুব সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে তা মারাত্মক হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তি এবং যাঁরা বাইরে কাজ করেন ও প্রয়োজন মতো পানি পান করার সুযোগ পান না, তাঁরাই মারাত্মক পানিস্বল্পতায় আক্রান্ত হন বেশি। এ ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং কিডনির সমস্যা হওয়াও বিচিত্র নয়।
পানিস্বল্পতা ছাড়াও গরমের কারণে ত্বকে ঘামাচি ও অ্যালার্জি হতে পারে। গরমের কারণে অতিরিক্ত ঘাম তৈরি হয়, যার চাপে ঘর্মগ্রন্থি ও নালি ফেটে যায়। এ কারণে ত্বকের নিচে ঘাম জমতে থাকে। এটাই ঘামাচি। অনেক সময় ঘাম ও ময়লা জমে ঘর্মনালির মুখ বন্ধ হয়ে যায় এবং সেখানে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। এতে ঘামাচি ও অ্যালার্জি বেড়ে যায় এবং ঘামে প্রচুর গন্ধ হতে পারে। ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও ঘাম ও ময়লার কারণে ছত্রাকজনিত রোগও এ সময়ে বেশি হয়।
গরমে যাঁরা সরাসরি সূর্যের আলোর নিচে বেশিক্ষণ থাকেন, তাঁদের ত্বক পুড়ে যেতে পারে। এতে ত্বক লাল হয়ে যায়, জ্বালাপোড়া করে, চুলকায় এবং ফোসকা পড়ে। মূলত সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিই এর জন্য দায়ী। যাঁরা একটু ফর্সা বা যাঁদের ত্বক নাজুক, তাঁদের এ সমস্যা বেশি হয়।
গরমের সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হলো হিটস্ট্রোক। শুরুতে হিটস্ট্রোকের আগে হিট ক্র্যাম্প দেখা দেয়, যাতে শরীর ব্যথা করে, দুর্বল লাগে এবং প্রচণ্ড পিপাসা লাগে। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়, মাথা ব্যথা করে এবং রোগী অসংলগ্ন আচরণ করতে থাকে। এ অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শরীরের তাপনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় এবং শরীরের তাপমাত্রা ১০৫০ ফারেনহাইট ছাড়িয়ে যায়। একে হিটস্ট্রোক বলে। এর লক্ষণগুলো হলো—তাপমাত্রা দ্রুত ১০৫০ ফারেনহাইট ছাড়িয়ে যায়, ঘাম বন্ধ হয়ে যায়, ত্বক শুষ্ক ও লাল হয়ে যায়, নিঃশ্বাস দ্রুত হয়, নাড়ির স্পন্দন ক্ষীণ ও দ্রুত হয়, রক্তচাপ কমে যায়, খিঁচুনি হয়, মাথা ঝিমঝিম করে এবং রোগী অসংলগ্ন ব্যবহার করতে থাকে। রোগীর প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়, অজ্ঞান হয়ে যায়—এমনকি শকেও চলে যেতে পারে।
গরমের সরাসরি প্রভাব ছাড়াও অন্য আনুষঙ্গিক সমস্যা হতে পারে। অনেকেই গরমে তৃষ্ণা মেটাতে বাইরে পানি বা শরবত খান, যা অনেক সময় বিশুদ্ধ হয় না। ফলে ডায়রিয়া ও বমিতে আক্রান্ত হতে পারেন। একই কারণে এ সময় পানিবাহিত অন্যান্য রোগ যেমন—টাইফয়েড, হেপাটাইটিস ইত্যাদি বেশি হয়। গরমে অনেকে প্রচুর পানি পান করেন, কিন্তু তাতে পর্যাপ্ত লবণ থাকে না, ফলে লবণের অভাব দেখা দেয়। গরমে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ওই খাবার খেলে বদহজমসহ অনেক পেটের পীড়া দেখা দিতে পারে।
গরমের এসব সমস্যা থেকে বেঁচে থাকার জন্য যা করতে হবে—
যথাসম্ভব ঘরের ভেতরে বা ছায়াযুক্ত স্থানে থাকতে হবে।
বাইরে বের হলে সরাসরি রোদ যত সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজনে টুপি বা ছাতা ব্যবহার করতে হবে। পরনের কাপড় হতে হবে হালকা, ঢিলেঢালা, সুতি কাপড়। শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখতে হব।
শরীরের উন্মুক্ত স্থানে সম্ভব হলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে, যা রোদে পোড়া থেকে সুরক্ষা দেবে।
প্রচুর পানি ও অন্যান্য তরল পান করতে হবে। যেহেতু ঘামের সঙ্গে পানি ও লবণ দুই-ই বের হয়ে যায়, সেহেতু লবণযুক্ত পানীয় যেমন খাবার স্যালাইন, ফলের রস ইত্যাদি বেশি করে পান করতে হবে। অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হবে। চা ও কফি যথাসম্ভব কম পান করা উচিত।
প্রয়োজনমতো গোসল করতে হবে এবং শরীর ঘাম ও ময়লামুক্ত রাখতে হবে।
শ্রমসাধ্য কাজ যথাসম্ভব কম করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছুক্ষণ পরপর বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রচুর পানি ও স্যালাইন পান করতে হবে।
গুরুপাক খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। সাধারণ খাবার যেমন—ভাত, ডাল, সবজি, মাছ ইত্যাদি খাওয়াই ভালো। খাবার যেন টাটকা হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নানা রকম ফল যেমন—আম, তরমুজ ইত্যাদি এবং লেবুর শরবত শরীরের প্রয়োজনীয় পানি ও লবণের ঘাটতি মেটাবে।
প্রচণ্ড গরমে কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগীকে দ্রুত শীতল কোনো স্থানে নিতে হবে, ফ্যান বা এসি ছেড়ে দিতে হবে—সম্ভব না হলে পাখা দিয়ে বাতাস করতে হবে। রোগীর গরম কাপড় খুলে ফেলতে হবে এবং ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে ফেলতে হবে। সম্ভব হলে গোসল করাতে হবে। রোগীকে প্রচুর পানি ও খাবার স্যালাইন পান করাতে হবে।
যদি কেউ হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয় এবং অজ্ঞান হয়ে যায়, তবে দ্রুত শরীরের তাপমাত্রা কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে রোগীকে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে; ঘরে চিকিৎসা করার কোনো সুযোগ নেই।
গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুদের বেলায় আরও জরুরি। স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়ে সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে দহনজনিত স্বাস্থ্যসমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
এ বি এম আবদুল্লাহ
ডিন, মেডিসিন অনুষদ, অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ০১, ২০১১